নিবন্ধ

প্রথম পাতা > নিবন্ধ
'ভোলা ময়রা' ছবিতে উত্তম কুমারের সঙ্গে
'মানিক-দা পরচুলা ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখলেন ঠিক লাগছে কিনা'

শর্মিলা ঠাকুরের জায়গায় সত্যজিৎ রায়ের 'অপুর সংসার' (১৯৫৯)-এ অভিনয়ের সুযোগ প্রায় হাতের নাগালে এসেও শেষ পর্যন্ত না পাওয়া, আর তারপর বহু বছর পরে 'জন অরণ্য' (১৯৭৬)-এর মাধ্যমে রায়ের ছবিতে অভিষেক—লিলি চক্রবর্তীর পথচলা যেন এক অনন্য চলচ্চিত্র-ইতিহাস।এ বছর জন অরণ্য মুক্তির ৫০ বছর পূর্তি। আজ ৮৪ বছর বয়সেও লিলি চক্রবর্তী বাংলা ও হিন্দি—দুই চলচ্চিত্র জগতেই তাঁর অসামান্য কাজের ভাণ্ডার নিয়ে গর্বিত। কখনও তপন সিংহের ছবির জন্য ভোর চারটেয় উঠে সারা শরীরে গাঢ় রঙের মেকআপ করিয়েছেন, আবার কখনও বলিউডে সহ-অভিনেত্রীর নিরাপত্তাহীনতার কারণে সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য বাদ পড়েছে। ভারতীয় সিনেমার বহু স্বর্ণযুগের সাক্ষী এই অভিনেত্রী। নিজের স্বভাবসিদ্ধ সরলতা ও বিনয়ের সঙ্গে তিনি সাংবাদিক ও লেখক অমৃতা মুখোপাধ্যায়কে জানালেন তাঁর দীর্ঘ অভিনয়জীবনের নানা অজানা গল্প, স্মৃতি আর অভিজ্ঞতার কথা।

কেন বিএফএ এই সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করল

 ১৯৫৮ সালে 'ভানু পেল লটারি' ছবির মাধ্যমে লিলি চক্রবর্তীর পর্দায় আত্মপ্রকাশ। তারপর প্রায় সাত দশকের অভিনয়জীবনে তিনি সঞ্চয় করেছেন অসংখ্য অমূল্য স্মৃতি, যার অনেকগুলোই আগে কখনও প্রকাশ্যে আসেনি। আমাদের ইচ্ছা ছিল, তিনি যেন শুধু উত্তম কুমার, গুলজার, তপন সিংহ কিংবা হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়ের মতো কিংবদন্তিদের নিয়েই কথা না বলেন; বরং তাঁর জীবনের সেই সব অপ্রকাশিত, অরক্ষিত স্মৃতির ভাণ্ডারও খুলে ধরেন, যা ভারতীয় সিনেমার ইতিহাসকে আরও সমৃদ্ধ করে।মুম্বইয়ে থাকার সময় প্রযোজক এন. সি. সিপ্পির সঙ্গে তাঁর যে পারিবারিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল—যিনি স্নেহভরে তাঁকে ‘বড়ি বেটি’ বলে ডাকতেন—সেই সব উষ্ণ স্মৃতিও এই আলাপচারিতার অংশ।এমন সূক্ষ্ম ও মূল্যবান ইতিহাস তুলে আনতে দরকার ছিল অধ্যবসায়, সংবেদনশীলতা এবং সাহিত্যিক মমত্ববোধের এক বিরল মিশ্রণ। সেই কারণেই আমরা অভিজ্ঞ সাংবাদিক ও লেখক অমৃতা মুখোপাধ্যায়কে এই দায়িত্ব দিয়েছিলাম। তাঁর আন্তরিক প্রশ্ন ও সংবেদনশীল উপস্থাপনায় উঠে এসেছে লিলি চক্রবর্তীর সহজ, অকৃত্রিম ও মাটির কাছাকাছি থাকা ব্যক্তিত্ব।এই দীর্ঘ সাক্ষাৎকার কেবল একজন অভিনেত্রীর স্মৃতিচারণ নয়; বরং ভারতীয় চলচ্চিত্রের এক বিস্তৃত ইতিহাস, যা এক প্রত্যক্ষ সাক্ষীর চোখে ধরা পড়েছে। তাই এটি নিঃসন্দেহে আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের এক মূল্যবান দলিল।

দমদমের এক শান্ত, নিরিবিলি কোণে দাঁড়িয়ে আছে চারতলা একটি অ্যাপার্টমেন্ট। সামনের পুকুর আর পাশের সবুজ ঘাসে ঢাকা জমিটুকু যেন গোটা এলাকাকে এক অন্য রকম প্রশান্তির আবরণে ঢেকে রেখেছে। ই-রিকশাটি বাড়ির সামনে এসে থামতেই চালক বললেন, ‘‘এই তো, আপনি যে বাড়িটা খুঁজছিলেন। এখানেই থাকেন লিলি চক্রবর্তী।’’ পাড়ার সকলেই তাঁকে চেনেন। শুধু অভিনেত্রী হিসেবে নয়, বরং একজন অত্যন্ত সহজ-সরল, মাটির মানুষ হিসেবেও। এই পরিচয়টাই লিলি চক্রবর্তী সব জায়গায় নিজের সঙ্গে বয়ে নিয়ে চলেছেন। চলচ্চিত্র জগত হোক কিংবা তার বাইরের মানুষজন— সবার কাছেই তিনি শ্রদ্ধার পাত্র। এর জন্য তাঁকে আলাদা করে কখনও কিছু করতে হয়নি। তাঁর আন্তরিক স্বভাব, স্নেহময় ব্যবহার আর বিনয়ী ব্যক্তিত্বই তাঁকে এই সম্মান এনে দিয়েছে। তাঁর ফ্ল্যাটে ঢুকেই চোখে পড়ে বসার ঘরের লাল দেয়ালে টাঙানো অসংখ্য ছবি। সেই ছবিগুলো যেন সাক্ষ্য দেয়— বাংলা সিনেমার বহু কিংবদন্তি শিল্পীদের সঙ্গেই তিনি কাজ করেছেন। আর মাত্র দু’বছর পর তিনি পূর্ণ করবেন চলচ্চিত্র জগতে তাঁর ৭০ বছরের দীর্ঘ যাত্রা।

প্রায় ৫০০টি ছবিতে অভিনয়ের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও নতুন ছবির কথা বলতে গেলেই আজও তাঁর চোখে ঝলসে ওঠে উত্তেজনার আলো। ৮৪ বছর বয়সেও তিনি বিশ্বাস করেন, কাজ এখনও তাঁর কাছে আসে বলেই তিনি অভিনয় চালিয়ে যাচ্ছেন। গর্বের সঙ্গেই জানান, গোটা কেরিয়ারে কখনও তাঁকে কাজের খোঁজ করতে হয়নি— কাজ নিজেই এসে ধরা দিয়েছে তাঁর হাতে। এর প্রধান কারণ ছিল তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত এবং অনায়াস অভিনয়শৈলী। শুরুতে থিয়েটারে অভিনয়ের সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন মুখে মুখে প্রশংসার সূত্রে। পরে সেই একই ভাবে চলচ্চিত্র জগতেও ছড়িয়ে পড়ে তাঁর খ্যাতি। শুটিং সেটে কখনও দেরি করে পৌঁছনো, রিহার্সালে অনীহা দেখানো কিংবা তারকাসুলভ খামখেয়ালিপনা—এ সব কোনও কিছুর সঙ্গেই তাঁর নাম জড়ায়নি। বরং তাঁর পেশাদারিত্ব এবং মাটির কাছাকাছি থাকা মানসিকতার জন্য তিনি সমান ভাবে প্রশংসিত হয়েছেন কলকাতা ও মুম্বই— দুই চলচ্চিত্র জগতেই। এমনকি সফল মালয়ালম ছবি 'প্রিয়া'-তেও তিনি এক শক্তিশালী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। উত্তমকুমার থেকে অমিতাভ বচ্চন, প্রসেনজিৎ থেকে সত্যজিৎ রায়, হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায় থেকে গুলজার— সবার সঙ্গেই কাজ করেছেন তিনি। আবার বর্তমান প্রজন্মের পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়, শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়-নন্দিতা রায় কিংবা কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের ছবিতেও তিনি সমান দক্ষতায় অভিনয় করে চলেছেন। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভ-কে দেওয়া এক অন্তরঙ্গ সাক্ষাৎকারে লিলি চক্রবর্তী কথা বলেছেন তাঁর দীর্ঘ চলচ্চিত্রজীবন, অভিনয়ের দক্ষতা অর্জনের পথ, কিংবদন্তি শিল্পীদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা এবং বর্তমান টলিউডের পরিচালক ও অভিনেতাদের সম্পর্কে তাঁর ভাবনা নিয়ে।

'জন অরণ্য' ছবিতে লিলি চক্রবর্তী

ঢাকা থেকে কলকাতায় এসে জীবনটা কি খুব কঠিন হয়ে উঠেছিল?

তখন আমার বয়স মাত্র পাঁচ। সময়টা ১৯৪৬-৪৭ সাল। আমরা ঢাকা থেকে কলকাতায় চলে আসি। বাবা তখন রোজগারের জন্য খুব লড়াই করছিলেন। আমার বড়মামা মধ্যপ্রদেশের একটি কয়লাখনিতে সার্ভেয়ার হিসেবে কাজ করতেন। উনি আমাদের সেখানে চলে যেতে বলেন। আমি ভর্তি হই পেঞ্চভিল হাই স্কুলে। কিন্তু দু’-এক বছরের মধ্যেই বাবা সিদ্ধান্ত নেন কলকাতায় ফিরে আসবেন, কারণ হিন্দি ভাষার সঙ্গে তিনি ঠিক মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। তবে আমি আর আমার ছোট ভাই থেকে গিয়েছিলাম। কারণ পড়াশোনার মাঝে ব্যাঘাত ঘটুক আমরা চাইনি। পরিবারের বাকি সবাই ফিরে এসেছিল কলকাতায়। মধ্যপ্রদেশে আমরা খুব সুন্দর একটি জায়গায় থাকতাম আর সেখানে আমার জীবনটা বেশ আনন্দেই কাটত। মাঝে মাঝেই দু’টি ভ্যান আসত সিনেমা দেখাতে, আর আমি দৌড়ে গিয়ে সেই সিনেমা দেখতাম। খুব ছোটবেলা থেকেই সিনেমার প্রতি আমার ভীষণ টান ছিল। তখন থেকেই স্বপ্ন দেখতাম, একদিন আমিও ক্যামেরার সামনে দাঁড়াব। দেব আনন্দকে আমার অসম্ভব ভাল লাগত। তাঁর 'জাল' ছবিটা আমি অন্তত সাত-আটবার দেখেছিলাম।

মুম্বইয়ে কাজ করতে গিয়ে কি দেব আনন্দের সঙ্গে দেখা হয়েছিল?

হ্যাঁ, হয়েছিল। তখন প্রভাত রায় মুম্বইয়ে সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করতেন। তিনি জানতেন, দেব আনন্দকে আমি কতটা পছন্দ করি। তাই একদিন তিনি আমাকে শুটিং সেটে নিয়ে গিয়ে দেব আনন্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। তিনি আমার সঙ্গে খুব ভাল ব্যবহার করেছিলেন। তবে সত্যি বলতে কী, একটু হতাশই হয়েছিলাম। পর্দায় তাঁকে যতটা সুদর্শন লাগত, বাস্তবে ততটা লাগেনি। তখন তাঁর বয়সও কিছুটা বেড়েছিল। যৌবনের সেই মোহময় চেহারাটা আর ছিল না।

ছোটবেলা থেকেই কি নায়িকা হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন?

না, সে ভাবে নয়। তবে ওই যে বললাম, সিনেমা আমি খুব ভালবাসতাম। মাঝে মাঝে নিজেকে নায়িকার জায়গায় কল্পনাও করতাম। কিন্তু অভিনেত্রী হব—এই উচ্চাকাঙ্ক্ষা কখনও ছিল না। মধ্যপ্রদেশে থাকাকালীন আমার মা দীপালি চক্রবর্তী বিভিন্ন উৎসব কিংবা রবীন্দ্রজয়ন্তীতে অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। নাটক মঞ্চস্থ করতেন, আর আমরা সেই নাটকে অভিনয় করতাম। অভিনয়ের খুঁটিনাটি প্রথম আমার মায়ের কাছ থেকেই শেখা। মা নিজেও দারুণ অভিনেত্রী ছিলেন। পরে কলকাতায় এসে তিনি নান্দীকারে যোগ দেন এবং অভিনয়ের জন্য যথেষ্ট প্রশংসাও পান। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে তিনি একাধিক নাটকে কাজ করেছিলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, তখন আমি নিজেই অভিনয়ের কাজে এত ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম যে মঞ্চে মায়ের অভিনয় দেখতে যাওয়ার সুযোগ আর হয়ে ওঠেনি। কলকাতায় ফিরে আমি অফিস ক্লাবে যোগ দিই এবং সেখানে নাটক করতাম। সেই সময় আমি মাধবী মুখোপাধ্যায়ের ছোট বোনের চরিত্রে অভিনয় করেছিলাম। আমার দিদিও তখন নাটক করতেন। তাঁর সঙ্গেই আমি রিহার্সালে যেতাম। সেখানেই একদিন কেউ আমাকে একটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দেন। আমি এক মুহূর্তও না ভেবে ছবির গল্প বা চরিত্র সম্পর্কে কিছু না জেনেই রাজি হয়ে যাই। পরে দিদি আমাকে খুব বকেছিলেন— বাবা-মাকে কিছু না জানিয়েই আমি কী ভাবে সম্মতি দিয়ে দিলাম! সেই ভাবেই ১৯৫৮ সালে 'ভানু পেল লটারি'-র মাধ্যমে চলচ্চিত্রে আমার আত্মপ্রকাশ ঘটে।

মধ্যপ্রদেশে থাকাকালীন আমার মা দীপালি চক্রবর্তী বিভিন্ন উৎসব কিংবা রবীন্দ্রজয়ন্তীতে অনুষ্ঠান আয়োজন করতেন। নাটক মঞ্চস্থ করতেন, আর আমরা সেই নাটকে অভিনয় করতাম। অভিনয়ের খুঁটিনাটি প্রথম আমার মায়ের কাছ থেকেই শেখা।

সিনেমায় সুযোগ পাওয়ার পরেও আপনি দীর্ঘদিন মঞ্চে অভিনয় চালিয়ে গিয়েছিলেন…

হ্যাঁ, অবশ্যই। অনেক দিন ধরেই আমি থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। বাণিজ্যিক নাটক করতে শুরু করি এবং স্টার থিয়েটারে আমি ছিলাম নিয়মিত মুখ। বলতে পারেন, সেই সময়কার প্রায় সব কিংবদন্তি শিল্পীর সঙ্গেই আমি কাজ করেছি। ছবি বিশ্বাস এবং সন্ধ্যা রায়ের সঙ্গে করেছি 'ডাকবাংলো'  নাটকে, আবার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে 'নামজীবন', যা বিপুল জনপ্রিয় হয়েছিল। এমনকি সৌমিত্রদা চলে যাওয়ার পাঁচ বছর আগেও আমরা একসঙ্গে 'আত্মকথা'  নাটকে অভিনয় করেছি। তিনি সব সময় আমার প্রতি ভীষণ স্নেহশীল ছিলেন। 'নামজীবন'  নাটকে আমি রাজি হওয়ায় তিনি খুব খুশি হয়েছিলেন, কারণ এই নাটকই তাঁকে মঞ্চে এক বিশেষ প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছিল। আমার পুরো অভিনয়জীবন জুড়েই থিয়েটার ছিল। মুম্বইয়ে শুটিংয়ের জন্য আমাকে ছুটি দেওয়া হত, যাতায়াতের সুবিধাও করে দেওয়া হত। এমনকি আমার অনুপস্থিতিতে কাউকে সাময়িক ভাবে নেওয়া হলেও আমি ফিরলেই আবার আমাকে ফিরিয়ে আনা হত। এটা আমার কাছে খুব বড় প্রাপ্তি ছিল। সিনেমার ব্যস্ততায় মাঝখানে কিছুটা সময় বাদ দিলে, আমি সব সময়ই মঞ্চের সঙ্গে যুক্ত থেকেছি।

'কাঁচ কাটা হীরে' ছবিতে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে

উত্তম কুমারের সঙ্গে একাধিক ছবিতে কাজ করেছেন। তাঁর সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

'বিপাশা', 'দেয়া নেয়া', 'দুই পুরুষ', 'ভোলা ময়রা'— এই সব ছবিতে আমি উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁর রসবোধ ছিল অসাধারণ। পুরো ইউনিটকে তিনি পরিবারের মতোই দেখতেন। প্রায়ই বলতেন, ‘‘লিলি এত স্বাভাবিক অভিনয় করে যে আমরা ঘাবড়ে যাই।’’ একটা ঘটনা আজও খুব মনে পড়ে। তখন আমি সবে পান খাওয়া শুরু করেছি আর জর্দার সঙ্গেও নতুন পরিচয়। কতটা কড়া হতে পারে, সে সম্পর্কে কোনও ধারণাই ছিল না। একদিন সুপ্রিয়াদি আর আমি জর্দা পান খেয়েছিলাম। আমি আবার একটু বাড়াবাড়ি করে বেশি জর্দা দিয়ে ফেলেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে শরীর খারাপ লাগতে শুরু করল। সবাই তখন আমাকে নিয়ে ব্যস্ত— কেউ বাতাস করছে, কেউ জল এনে দিচ্ছে। ঠিক তখনই উত্তমকুমার এসে উপস্থিত। চারপাশের হইচই দেখে তিনি শান্ত ভাবে আমার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘‘সহ্য যখন হয় না, খাও কেন?’’ একেবারে বড়দাদার মতো স্নেহমিশ্রিত ভর্ৎসনা। তার পর চুপচাপ চলে গেলেন। আরেকটি মজার স্মৃতি আছে 'ভোলা ময়রা'  ছবির শুটিংয়ের সময়কার। ছবিতে আমি তাঁর স্ত্রীর চরিত্রে অভিনয় করছিলাম। একটি দৃশ্যে তাঁকে আমায় জড়িয়ে ধরতে হত। দৃশ্য শেষ হয়ে গেলেও তিনি আমাকে ছাড়ছিলেন না। মজা করে বলছিলেন, ‘‘এবার আর তোকে ছাড়ব না।’’ আমি তখন সেটে উপস্থিত সুপ্রিয়াদিকে ডাকলাম। উত্তমকুমার হেসে বললেন, ‘‘সুপ্রিয়াদিও তোকে বাঁচাতে পারবে না, এখন তুই আমার অনস্ক্রিন বউ।’’ সেট জুড়ে তখন হাসির রোল উঠেছিল।

'বিপাশা', 'দেয়া নেয়া', 'দুই পুরুষ', 'ভোলা ময়রা'— এই সব ছবিতে আমি উত্তমকুমারের সঙ্গে কাজ করেছি। তাঁর রসবোধ ছিল অসাধারণ। পুরো ইউনিটকে তিনি পরিবারের মতোই দেখতেন। প্রায়ই বলতেন, ‘‘লিলি এত স্বাভাবিক অভিনয় করে যে আমরা ঘাবড়ে যাই।’’

সিনেমায় আপনার অভিনয় জীবনের শুরু ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। আর সমিত ভঞ্জ, দিলীপ রায় ও শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতাদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও জানতে চাই।

 'ভানু পেল লটারি'  ছবিতে আমার সঙ্গে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের খুব বেশি দৃশ্য ছিল না। তবে পরে 'ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট'-এর মতো ছবিতে আমরা একসঙ্গে কাজ করেছি। তিনি ছিলেন অসম্ভব রসিক মানুষ। আউটডোর শুটিংয়ে সব সময় সবাইকে হাসিয়ে মাতিয়ে রাখতেন। আবার ভীষণ স্নেহশীল এবং দায়িত্ববানও ছিলেন। এমন ভাবে সবার খোঁজখবর রাখতেন, যেন তিনি নিজেই প্রোডাকশন টিমের একজন। আমাদের কোনও অসুবিধা হচ্ছে কি না, সব সময় খেয়াল রাখতেন। এটা তাঁর করার কথা ছিল না, কিন্তু তিনি খুব স্বতঃস্ফূর্তভাবেই করতেন।

শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায় ছিলেন অত্যন্ত ভাল মানুষ। বিজন থিয়েটারে তাঁর সঙ্গে আমি 'বিলকিস বেগম'  নাটকে অভিনয় করেছি। তবে একটা বিষয় ছিল— মঞ্চে যদি তিনি মনে করতেন, তাঁর বিপরীতে অভিনয় করা অভিনেতা বা অভিনেত্রী সংলাপ ঠিক মতো বলতে পারছেন না, তখন তিনি বিরক্ত হয়ে ‘ধুর’ বলে ফেলতেন। এমনকি দর্শকরাও সেটা শুনতে পেতেন। ফলে যাঁরা তাঁর সঙ্গে অভিনয় করতেন, তাঁদের জন্য বিষয়টা মাঝে মাঝে বেশ অস্বস্তিকর হয়ে উঠত।

সমিত ভঞ্জ ছিলেন ভীষণ প্রাণখোলা এবং উষ্ণ স্বভাবের। 'কেদার রাজা'  ছবির শুটিংয়ের সময় আমরা তমলুকে তাঁদের বাড়িতেই ছিলাম। তখন সমিত মূলত থিয়েটার করতেন। ছবিতে একটি ছোট চরিত্র ছিল— একজন পুলিশ অফিসারের। তাঁকে সেই চরিত্রটি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়, আর তিনি খুব সহজেই রাজি হয়ে যান। মজার বিষয় হল, সেটাই ছিল তাঁর চলচ্চিত্রে প্রথম অভিনয়।

দিলীপ রায়ও ছিলেন অত্যন্ত আন্তরিক এবং বন্ধুত্বপূর্ণ। তাঁর মধ্যে কোনও অহংকার ছিল না, কখনও তারকাসুলভ আচরণও করতেন না। তিনি আমার স্বামীর খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। আমাদের দুই পরিবারের মধ্যেও খুব ভাল সম্পর্ক ছিল—এক জন আরেক জনের বাড়িতে যাতায়াত ছিল নিয়মিত। তাঁর সঙ্গে আমি 'রাজদ্রোহী'  নাটকে অভিনয় করেছিলাম, যা বিরাট জনপ্রিয় হয়েছিল। নাটকের শেষ দৃশ্যে যখন তাঁর ফাঁসি হওয়ার মুহূর্ত আসত, তখন তাঁর অভিনয় ছিল অসাধারণ। শুধু সেই দৃশ্য দেখার জন্যই মানুষ ভিড় জমাত থিয়েটারে।

বাঁ দিকে 'আলাপ' ছবিতে অমিতাভ বচ্চনের সঙ্গে, ডান দিকে 'ভানু গোয়েন্দা জহর অ্যাসিস্ট্যান্ট' ছবিতে শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে

সত্যজিৎ রায়ের 'জন অরণ্য'  ছবিতে আপনার সুযোগটা কী ভাবে এল?

আসলে 'অপুর সংসার' ছবির সময়ই সত্যজিৎ রায় আমাকে প্রথম ডাকেন। তখন শর্মিলা ঠাকুরের স্কুল থেকে দীর্ঘদিন শুটিং করার অনুমতি নিয়ে কিছু সমস্যা তৈরি হয়েছিল। তাই প্রয়োজন হলে বিকল্প অভিনেত্রী হিসেবে কাউকে ভাবছিলেন। সেই কারণেই আমাকে ডাকা হয়েছিল। তিনি খুব স্পষ্ট ভাবেই আমাকে পুরো বিষয়টা জানিয়েছিলেন আর তাতে আমার কোনও আপত্তিই ছিল না। আমি তখন নববধূর সাজে প্রস্তুত হয়েছিলাম, আর আমাকে তাঁর খুব পছন্দও হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শর্মিলাই ছবিটা করেন। সময়টা ছিল প্রায় ১৯৫৮ সাল। তার পর ১৯৭৬ সালে তিনি আবার ডাকলেন 'জন অরণ্য' ছবির জন্য। আমি তো আনন্দে আত্মহারা। তখন আমি চুল একটু ছোট করে কেটেছিলাম, তাই ছবিতে উইগ ব্যবহার করতে হয়েছিল। কিন্তু সত্যজিৎ রায়ের সন্দেহ ছিল, উইগটা আদৌ স্বাভাবিক লাগছে কি না। ফলে প্রথম দিন তিনি বারবার আমার দিকে তাকাচ্ছিলেন, উইগ ছুঁয়ে দেখছিলেন সব ঠিক আছে কি না। তিনি ছিলেন ভীষণ খুঁতখুঁতে। কয়েকটি শট নেওয়ার পর তিনি নিশ্চিত হন সব ঠিক আছে। তার পর আর উইগ নিয়ে মাথা ঘামাননি। 'জন অরণ্য'-র প্রায় পনেরো বছর পরে আবার তিনি আমাকে ডাকেন 'শাখাপ্রশাখা' ছবির জন্য। আমি ঘরে ঢুকতেই তিনি বললেন, ‘‘শুনেছিলাম তুমি নাকি অনেক মোটা হয়ে গেছো, কিন্তু তা তো মনে হচ্ছে না। এখন যেমন আছো, আমার ছবির বড়বউয়ের চরিত্রে একেবারে মানিয়ে যাবে।’’ তিনি যদি বলতেন ওজন কমাতে হবে, আমি কয়েক দিনের মধ্যেই তা করে ফেলতাম। তাঁর জন্য আমি সব কিছু করতে প্রস্তুত ছিলাম। সত্যজিৎ রায় আমাদের প্রত্যেককে অসম্ভব সম্মান দিতেন। কোনও শট ভাল না হলে কখনও বলতেন না, ‘‘তুমি ঠিক করোনি’’ বা ‘‘আরও ভাল করতে হবে।’’ বরং বলতেন, ‘‘আমার একটু ভুল হয়েছে। আরেকটা শট নেওয়া যাবে?’’

সত্যজিৎ রায় আমাদের প্রত্যেককে অসম্ভব সম্মান দিতেন। কোনও শট ভাল না হলে কখনও বলতেন না, ‘‘তুমি ঠিক করোনি’’ বা ‘‘আরও ভাল করতে হবে।’’ বরং বলতেন, ‘‘আমার একটু ভুল হয়েছে। আরেকটা শট নেওয়া যাবে?’’

সত্যজিৎ রায় ছাড়াও বাংলা ও হিন্দি সিনেমার বহু কিংবদন্তি পরিচালকের সঙ্গে আপনি কাজ করেছেন। তাঁদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

মৃণাল সেন

মৃণাল সেনের সঙ্গে একটি টেলিভিশন সিরিয়ালে কাজ করি, যদিও এখন নামটা মনে নেই। তার পর তিনি আমাকে 'একদিন অচানক'  ছবির জন্য ডাকেন। তিনি কখনও বলে দিতেন না কী ভাবে অভিনয় করতে হবে বা কী ভাবে আবেগ প্রকাশ করতে হবে। বরং শিল্পীকে নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা দিতেন। সত্যজিৎ রায় এবং মৃণাল সেন— দু’জনেই ছিলেন ভীষণ সংগঠিত এবং জানতেন ঠিক কী চান। আর দু’জনেই শিল্পীদের যথেষ্ট সম্মান দিতেন।

তপন সিংহ

 আমি তখন অনিল চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে 'আহ্বান'  ছবিতে কাজ করছি। তিনিই আমাকে তপন সিংহের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন। কী ভদ্র মানুষ ছিলেন তিনি! আমি তাঁর অফিসে ঢুকতেই উঠে দাঁড়িয়ে জোড়হাতে অভিবাদন জানিয়েছিলেন। প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন, 'হাঁসুলি বাঁকের উপকথা'  ছবির সাঁওতাল মেয়ের চরিত্রের জন্য আমি হয়তো একটু বেশিই ফর্সা। পরে অবশ্য বললেন, মেকআপে গায়ের রং গাঢ় করে নেওয়া যাবে। শুটিং শুরু হওয়ার পর ভোর চারটেয় উঠে সারা শরীরে গাঢ় রঙের মেকআপ লাগাতে হত। আবার শুটিং শেষ হলে, বিশেষ করে শীতের রাতে, দীর্ঘ সময় ধরে স্নান করে সেই রং তুলে ফেলতে হত। খুব সহজ ছিল না, কিন্তু আমি সব সময় চরিত্রের জন্য অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে প্রস্তুত ছিলাম।

তরুণ মজুমদার

রাখীর প্রাক্তন স্বামী, সাংবাদিক থেকে পরিচালক হওয়া অজয় বিশ্বাসকে আমি চিনতাম। মুম্বইয়ে গেলে তিনিই আমাকে তরুণ মজুমদারের সঙ্গে দেখা করাতে নিয়ে যান। তরুণবাবু পুরো চিত্রনাট্য আমাকে পড়ে শুনিয়েছিলেন। গল্প এত ভাল লেগেছিল যে, সঙ্গে সঙ্গেই রাজি হয়ে যাই। ছবিটি ছিল 'ফুলেশ্বরী'। মুখ্য ভূমিকায় ছিলেন সন্ধ্যা রায়। ছবিটি পরে বিরাট সাফল্য পায়।

হৃষীকেশ মুখোপাধ্যায়

তাঁর সঙ্গে আমি 'আলাপ'  এবং 'চুপকে চুপকে'-র মতো ছবিতে কাজ করেছি। তিনি আমাকে সব সময় খুব উৎসাহ দিতেন। তখন আমি মুম্বইয়ে তাঁর একটি ছবির শুটিং করছি, এমন সময় সত্যজিৎ রায়ের কাছ থেকে 'জন অরণ্য'-তে অভিনয়ের প্রস্তাব এল চিঠির মাধ্যমে। হৃষীদা আমাকে বলেছিলেন, ‘‘আমরা অপেক্ষা করব, তুমি আগে রায়ের ছবিটা করে এসো।’’ আমি সঙ্গে সঙ্গে কলকাতায় ফিরে আসি। এই ধরনের সহযোগিতাই আমি তাঁর কাছ থেকে পেয়েছিলাম।

পীযূষ বসু

তিনি আমাকে 'ভোলা ময়রা'  এবং 'দুই পৃথিবী'  ছবিতে পরিচালনা করেছিলেন। তিনি মূলত নাট্যজগতের মানুষ ছিলেন এবং নাট্যগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। অসাধারণ অভিনেতা ছিলেন তিনি। আমরা মঞ্চে তাঁর অভিনয় মুগ্ধ হয়ে দেখতাম। পরিচালনাতেও তিনি ছিলেন সমান দক্ষ।

সুশীল মুখোপাধ্যায়

তিনি আমাকে 'দুই পুরুষ'  ছবিতে পরিচালনা করেছিলেন। একটা ঘটনা এখনও মনে আছে। এক অভিনেত্রীর একটি দৃশ্যে কাঁদার কথা ছিল। তখন তো গ্লিসারিনের চল ছিল না, তাই চোখের জল স্বাভাবিক ভাবেই আনতে হত। কিন্তু তিনি কিছুতেই কাঁদতে পারছিলেন না। হঠাৎ সুশীল মুখোপাধ্যায় তাঁকে একটা জোরে চড় মেরে বললেন, ‘‘এবার শট নেওয়া যাক।’’ অভিনেত্রী তখন সত্যিই কাঁদতে শুরু করেছিলেন। ঘটনাটা দেখে আমি ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, কোনওদিন যদি আমিও কাঁদতে না পারি, তাহলে আমাকেও কি চড় খাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে? যদিও সৌভাগ্যবশত, আমার সঙ্গে কখনও তেমন কিছু ঘটেনি।

স্বামী অজিত কুমার ঘোষের সঙ্গে

গুলজার

একদিন আমি পরিচালক-গীতিকার মুকুল দত্তর বাড়িতে গিয়েছিলাম। তিনি বিখ্যাত অভিনেত্রী চাঁদ উসমানিকে বিয়ে করেছিলেন। তাঁদের বাড়িতে ঢুকলেই মাছ রান্নার গন্ধ পাওয়া যেত। চাঁদ উসমানি নাকি গুলজারের জন্য মাছের ঝোল রান্না শিখেছিলেন, কারণ উনি সেটা খুব ভালোবাসতেন। সেখানেই মুকুল দত্ত আমাকে বললেন, গুলজার সাব আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। পরে গুলজার সাব তাঁর গাড়ি পাঠালেন, আর আমি তাঁর অফিসে গেলাম। অফিসে তখন খুব ভিড় ছিল, তাই তিনি আমাকে অন্য একটি ঘরে নিয়ে গেলেন। সেখানে তিনি বললেন, আমি নাকি তাঁর ছবির চরিত্রটির জন্য একেবারে উপযুক্ত, আর তিনি আমাকে দেয়া নেয়া ছবিতে দেখেছেন। গুলজার সাব আমার সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হল, আমি হিন্দি কতটা ভাল বলতে পারি, সেটা তো তিনি জানেন না। তখন আমি হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করি। তিনি ভীষণ অবাক হয়ে বললেন, ‘‘তুমি এত ভাল হিন্দি বলো কী ভাবে? শর্মিলা আর রাখী— দু’জনেরই তো হিন্দি বলার মধ্যে বাঙালি টান রয়েছে!’’ তখন আমি তাঁকে আমার মধ্যপ্রদেশে কাটানো ছোটবেলার কথা বলি। সেখান থেকেই আমার প্রথম হিন্দি ছবি 'অচানক' (১৯৭৩)-এ কাজের সুযোগ হয়। ছবিতে আমার বিপরীতে ছিলেন বিনোদ খান্না। ছবিটি তৈরি হয়েছিল বহুল আলোচিত কেএম নানাবতীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে। পরে গুলজার সাব আমাকে 'মৌসম'  (১৯৭৫) ছবিতেও অভিনয়ের সুযোগ দেন। সেদিন তাঁর অফিস থেকে বেরোনোর সময় ঘরের কোণে একজোড়া হাই হিল জুতো চোখে পড়েছিল। সঙ্গে সঙ্গেই বুঝে গিয়েছিলাম, ওগুলো রাখীর।

রাখীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল? তিনি কি আপনার জন্য গুলজারের কাছে সুপারিশ করেছিলেন?

রাখীর সঙ্গে আমার খুব ভাল সম্পর্ক ছিল। রানাঘাট থেকে যখন তিনি অভিনেত্রী সন্ধ্যা রায়ের সঙ্গে কলকাতায় আসেন, তখন থেকেই আমি তাঁকে চিনতাম। পরে তিনি সাংবাদিক অজয় বিশ্বাসকে বিয়ে করেন। অনেক সময় অজয় তাঁকে আমাদের বাগবাজারের বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে যেতেন। কারণ বাড়িতে একা থাকতে তাঁর ভাল লাগত না, আমাদের বাড়িতে সময় কাটাতেই বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করতেন। আমার স্বামী অজিতকে তিনি নিজের বড়দাদার মতো মনে করতেন। একবার আমার স্বামী তাঁর হাত দেখে বলেছিলেন, ‘‘একদিন তোমার অনেক টাকা হবে।’’ আমাদের পাড়া থেকে প্রতি বছর ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালে পিকনিক হত। রাখীও আমাদের সঙ্গে যেতেন। পরে অজয় মুম্বইয়ে চলে যান এবং রাখীও তাঁর সঙ্গে যান। সেখানে গিয়ে তিনি আমার স্বামীর সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছিলেন, অজয় নাকি তাঁকে ব্যবহার করে মুম্বইয়ে নিজের পথ তৈরি করতে চাইছেন আর তাতে তিনি খুব অসুখী। এর পর তাঁদের বিচ্ছেদ হয়ে যায় এবং তার পরই মুম্বইয়ে রাখীর কেরিয়ার দ্রুত সাফল্যের মুখ দেখে। পরে তিনি গুলজারকে বিয়ে করেন। শুনেছি, গুলজার  সাব আমাকে নির্বাচন করার পর রাখী নাকি তাঁকে বলেছিলেন, ‘‘লিলি খুব ভালো অভিনেত্রী।’’ এখন অবশ্য আমাদের আর যোগাযোগ নেই। রাখী কলকাতায় বাংলা ছবির শুটিং করতে এলেও কোনও দিন আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। আমি আজও একই মানুষ রয়ে গেছি, কিন্তু মানুষ সময়ের সঙ্গে বদলে যায়। তাই পুরনো সম্পর্ক আবার নতুন করে জোড়া লাগানোর ক্ষেত্রে আমার একটু সংকোচ কাজ করে— কে কী ভাবে নেবে, তা তো জানা যায় না।


গুলজার সাব আমার সঙ্গে বাংলাতেই কথা বলছিলেন। কিন্তু হঠাৎ তাঁর মনে হল, আমি হিন্দি কতটা ভাল বলতে পারি, সেটা তো তিনি জানেন না। তখন আমি হিন্দিতে কথা বলতে শুরু করি। তিনি ভীষণ অবাক হয়ে বললেন, ‘‘তুমি এত ভাল হিন্দি বলো কী ভাবে?

এত দীর্ঘ এবং সমৃদ্ধ কর্মজীবনের পরেও কী ভাবে এতটা মাটির মানুষ হয়ে থাকতে পেরেছেন?

এটাই আমার স্বভাব। আমি কখনও সাফল্যকে মাথায় চড়তে দিইনি। সব সময় একই রকম থেকেছি। কেউ যদি আমাকে আন্তরি কভাবে সম্ভাষণ জানায়, আমি তাকে একই উষ্ণতায় উত্তর দিই। পরিচালক বা প্রযোজকদের জন্য আমি কোনও দিন সমস্যা তৈরি করিনি। হয়তো সেই কারণেই আমাকে কখনও কাজের খোঁজে ছুটতে হয়নি। মানুষ নিজে থেকেই আমার কাছে চরিত্র নিয়ে এসেছে। কারণ তারা জানত, আমি নিষ্ঠা আর পেশাদারিত্বের সঙ্গে কাজটা করব।

কখনও কি এমন হয়েছে, শেষ মুহূর্তে আপনাকে কোনও ছবি থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে?

ভাগ্যক্রমে এমন ঘটনা আমার সঙ্গে কখনও ঘটেনি। তবে আমার চরিত্রের অনেক অংশ কেটে দেওয়া হয়েছিল। একটি ছবিতে সঞ্জীব কুমারের সঙ্গে আমার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ এবং আবেগঘন দৃশ্য ছিল। তিনি আমার অভিনয় খুব পছন্দ করেছিলেন। কিন্তু ছবির নায়িকা নাকি আমার অভিনয় নিয়ে কিছুটা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছিলেন। পরে দেখলাম, আমার বেশির ভাগ দৃশ্যই কেটে দেওয়া হয়েছে। বিষয়টা আমার কাছে খুব হতাশাজনক ছিল। আর একটা সমস্যার মুখোমুখি আমাকে বহু বার হতে হয়েছে— পারিশ্রমিক না পাওয়া। কত বার যে কাজের টাকা পাইনি, তার হিসেবই নেই। তবে আমি কোনও দিন টাকাপয়সা নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামাইনি। তাই সেই বকেয়া টাকার জন্যও বিশেষ তাগাদা দিইনি।

নতুন প্রজন্মের পরিচালকদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন?

আমি ওদের সঙ্গে কাজ করতে ভীষণ উপভোগ করি। 'রাজকাহিনী'  ছবির সময় সৃজিত মুখোপাধ্যায় নিয়মিত রিহার্সাল করাতেন। আমি সময় মতো পৌঁছে যেতাম। তখন যারা দেরি করত বা আসত না, তাদের উদ্দেশে সৃজিত বলতেন— ‘‘এই বয়সেও লিলিদি কী নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন, সেটা সবার শেখা উচিত।’’ 'চোখের বালি'  ছবির সময় ঋতুপর্ণ ঘোষ আমাকে ‘তুই’ বলে সম্বোধন করত। ওর মা অবশ্য সেটা পছন্দ করতেন না। কারণ বয়সে আমি ওর থেকে অনেক বড়। কিন্তু আমার বিষয়টা খুব মিষ্টি লাগত। আমি বুঝতাম, এটা ওর স্নেহ প্রকাশের নিজস্ব ভঙ্গি। কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমি 'খাদ', 'অর্ধাঙ্গিনী' এবং 'অযোগ্য'  ছবিতে কাজ করেছি। তিনি অত্যন্ত গোছানো পরিচালক। আবার ২০১৬ সালে 'পোস্ত'  ছবির সময় শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায় আমার খুব যত্ন নিয়েছিলেন। সম্প্রতি সুমন ঘোষের 'ফ্যামিলিওয়ালা'  ছবিতেও কাজ করেছি, আর সেই অভিজ্ঞতাও ভীষণ উপভোগ করেছি। এখনকার অনেক তরুণ পরিচালক শট শেষ হওয়ার পরে আমাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘‘আপনার কি মনে হয় শটটা ঠিক হয়েছে?’’ আমি যদি কোনও পরামর্শ দিই, ওরা খুব সহজ ভাবেই সেটা গ্রহণ করে। আমার প্রতি ওদের এই সম্মান আমি খুব যত্ন নিয়ে মনে রাখি।

ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের মাঠে পিকনিক। রয়েছেন রাখীও

কলকাতা ও মুম্বই— দুই জায়গাতেই আপনি কাজ করেছেন। তখনকার এবং এখনকার শুটিং সেটের পরিবেশে কী পার্থক্য দেখেন?

দুই জায়গাতেই সেটে খুব বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ থাকত। আমার বরাবরই একটা অভ্যাস ছিল— নিজের শট না থাকলেও সেটে বসে অন্যদের অভিনয় দেখতাম, শিখতাম। এখনও সেই অভ্যাস আছে। আমি শট শেষ হলেই মেকআপ রুমে ফিরে যাই না। সেটে আড্ডা তো খুব স্বাভাবিক বিষয়। সিনেমার শুটিংয়ে সময় কম পাওয়া যায়। সিরিয়ালের ক্ষেত্রে সময় একটু বেশি থাকে। এখনও নতুন প্রজন্মের অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সঙ্গে আমার আড্ডা হয়। তবে একটা জিনিস খেয়াল করেছি— এখনকার নায়করা সহজেই মিশে যায়, কিন্তু নায়িকারা সচেতন ভাবেই একটা দূরত্ব বজায় রাখে। মুম্বইয়ে আমার অনেকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে প্রযোজক এন.সি. সিপ্পি আমাকে নিজের ‘বড়ি বেটি’ বলে ডাকতেন। আমি প্রায়ই তাঁর বাড়িতে যেতাম, সবার সঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করতাম। কলকাতা থেকে মিষ্টি নিয়ে যেতাম। সত্যিই মনে হত, যেন আমি পরিবারেরই একজন। আমি তখন রঙমহলে নাটক করছি, সেই সময় তিনি তাঁর ছেলে রাজ এন. সিপ্পি পরিচালিত 'ইনকার' ছবির জন্য আমাকে ডাকেন। বলেছিলেন, ‘‘আমার বড়ি বেটিকে ছাড়া এই ছবি শুরুই হতে পারে না।’’ তারপর নিজেই টিকিট পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কলকাতায় অবশ্য কারও সঙ্গে এতটা ব্যক্তিগত সম্পর্ক তৈরি হয়নি। খুব একটা কারও বাড়িতেও যাইনি। এটাও বলতে পারেন, আমি সচেতন ভাবেই একটা সীমারেখা বজায় রেখেছিলাম।

এত ব্যস্ততার মধ্যেও আপনি সব সময় পরিবারের দায়িত্ব সামলেছেন। কী ভাবে সম্ভব হত?

শুটিং থেকে ফিরেও আমি রান্না করতাম। কারণ আমার স্বামী অন্য কারও হাতের রান্না খেতে চাইতেন না। কখনও কখনও রাত দশটায় বাড়ি ফিরে রান্না করেছি। আবার পরদিন ভোরে শুটিং থাকলে হেয়ারড্রেসারকে বলতাম আমার সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে বাড়িতেই থেকে যেতে। তারপর সকালে আমরা একসঙ্গে শুটিংয়ে বেরোতাম। জীবন তখন এমনই ছিল। আমার স্বামী আমার পরিবারের জন্য অনেক কিছু করেছেন। আমার ভাইরা বড় হওয়া পর্যন্ত আমিও আর্থিক ভাবে পুরো পরিবারকে সামলেছি। অনেক দিন পর্যন্ত আমরা জানতামও না, আমার বাবার আগে আমার মাসির সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল এবং আমাদের তিন ভাইবোন আসলে মাসির সন্তান। মাসির মৃত্যুর পর পরিবার সিদ্ধান্ত নেয়, আমার মায়ের সঙ্গে বাবার বিয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু এই সত্যিটা জানার পরেও আমাদের ভালবাসার সম্পর্কে কোনও পরিবর্তন আসেনি।

৮৪ বছর বয়সেও আপনি কাজ করে চলেছেন। এখন কি কাজের চাপ ক্লান্তিকর লাগে?

আমি এখনও শুটিং সেটে থাকতে খুব ভালবাসি। তরুণদের মাঝে থাকলে আমার ভীষণ আনন্দ হয়। 'নিম ফুলের মধু'  ধারাবাহিকে পরিবারের প্রধান মহিলার চরিত্রে অভিনয় করে খুব আনন্দ পেয়েছিলাম। তবে এখন আমার মনে হয়, বেশির ভাগ ধারাবাহিকের গল্প আর কোথাও এগোচ্ছে না। তাই আর সিরিয়াল করতে ইচ্ছা করে না। তবে সিনেমা করছি। আর খুব শিগগিরই অভিজ্ঞান মুখোপাধ্যায়ের 'অনুমানের ভিত্তিতে' ছবির শুটিংও শুরু করব।

মুম্বইয়ে আমার অনেকের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। বিশেষ করে প্রযোজক এন.সি. সিপ্পি আমাকে নিজের ‘বড়ি বেটি’ বলে ডাকতেন। আমি প্রায়ই তাঁর বাড়িতে যেতাম, সবার সঙ্গে বসে খাওয়াদাওয়া করতাম।
অমৃতা মুখোপাধ্যায় ভারতের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলিতে দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ সম্পাদকীয় পদে কাজ করেছেন। তাঁর কর্মজীবনের উল্লেখযোগ্য অধ্যায়গুলির মধ্যে রয়েছে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া, হিন্দুস্তান টাইমস এবং দ্য এশিয়ান এজ-এ পূর্ণ সময়ের সম্পাদকীয় দায়িত্ব পালন। এ ছাড়াও তিনি দুবাইয়ের জনপ্রিয় গ্ল্যামার ম্যাগাজিন মাসালা!–এর ফিচারস এডিটর ছিলেন, যা মূলত বলিউড-কেন্দ্রিক বিষয়বস্তুর জন্য পরিচিত। বিনোদন সাংবাদিকতায় দুই দশকেরও বেশি অভিজ্ঞতার অধিকারী অমৃতা বর্তমানে স্বাধীন সাংবাদিক হিসেবে কাজ করছেন। পাশাপাশি তিনি তাঁর নিজস্ব ব্লগ amritaspeaks.in-এ নিয়মিত লেখালেখি করেন। সাহিত্য জগতেও তাঁর অবদান উল্লেখযোগ্য। তিনি রূপা পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত ‘এক্সিট ইন্টারভিউ’-এর রচয়িতা—যা সাংবাদিকতার জগতকে কেন্দ্র করে লেখা একটি উপন্যাস। এ ছাড়া রিডোম্যানিয়া থেকে প্রকাশিত ‘মিউজিয়াম অব মেমোরিজ’ নামে একটি ছোটগল্প সংকলন এবং ‘দ্য সিক্রেট ডায়েরি অব আ ক্রিমিনাল লইয়ার’ নামে একটি তথ্যভিত্তিক গ্রন্থও তাঁর কলমে রচিত। শেষোক্ত বইটি এক কিংবদন্তি আইনজীবীর জীবন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা হয়েছে।সাংবাদিকতা ও সাহিত্য— দুই ক্ষেত্রেই অমৃতা মুখোপাধ্যায় তাঁর সংবেদনশীল দৃষ্টিভঙ্গি, গভীর পর্যবেক্ষণশক্তি এবং সাবলীল লেখনীর জন্য বিশেষভাবে সমাদৃত।