'ইন্দ্রাণী' ছবিতে উত্তম কুমার এবং সুচিত্রা সেন
নারীর চোখ: বাংলা ছবিতে ক্ষমতা, সম্পর্ক ও দেখার ধরণধারণ
তারিখ : 01-January-1970
১৯৬৪ সালের ছবি "জতুগৃহ"। পরিচালক তপন সিংহ। ছবির শেষে এক নারী না বলছেন— তাঁর প্রাক্তন স্বামীর সঙ্গে আবার মিলিত জীবন শুরু করতে অস্বীকার করছেন। এক সময় যে সীমারেখা টানা হয়েছিল, তাকেই সম্মান জানাতে চাইছেন। এর দুই দশক পরে ওই একই ছোট গল্প অবলম্বনে গুলজার পরিচালিত "ইজাজত" ছবিতে দেখা যায় প্রাক্তন স্ত্রী নতুন জীবন শুরু করার আগে যেন অনুমতি চাইছেন। এই মৌলিক পার্থক্য আমাদের সামনে সিনেমার এক গভীর প্রশ্ন তুলে ধরে: শুধু কে দেখছে সেটা নয়, বরং কী ভাবে দেখা হচ্ছে, গুরুত্বপূর্ণ সেটাও।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে চলচ্চিত্র নির্মাতা ও লেখক দেবারতি গুপ্ত কাটাছেঁড়া করেছেন ফিমেল গেজ বা নারীর দৃষ্টির ধারণাকে— এ এমন এক দেখা যা পুরুষকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির সীমা অতিক্রম করে। ১৯৩৭ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত বিস্তৃত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বাংলা চলচ্চিত্রের উদাহরণ টেনে দেবারতি দেখিয়েছেন, কী ভাবে সিনেমা পিতৃতান্ত্রিক উপস্থাপনার কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এবং যখন আমরা একটি দৃষ্টিকে নতুন ভাবে পড়তে শিখি তখন আর কী কী দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।
কেন বিএফএ এই নিবন্ধ বেছে নিল: বাংলা সিনেমার আবেগ ও কাঠামোগত পরিসরকে নতুন ভাবে ব্যাখ্যা করতে
হলে নারীর দৃষ্টিভঙ্গি বা ফিমেল গেজ-এর অনুসন্ধান অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। একজন সক্রিয় পরিচালক চলচ্চিত্র নির্মাণের কারিগরিকে গভীর ও
প্রত্যক্ষ ভাবে বোঝেন—শিল্পীর অভিপ্রায় এবং প্রযুক্তিগত রূপায়ণের মধ্যে সেতুবন্ধন
করতে পারেন। এই কারণেই আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভ (BFA) দেবারতি গুপ্তকে এই
লেখাটি লেখার জন্য অনুরোধ করেছে। আমাদের আর্কাইভের মূল লক্ষ্য হলো দীর্ঘমেয়াদি, বিশ্লেষণধর্মী গবেষণার মাধ্যমে চলচ্চিত্রের মূল্যবান
নিদর্শনগুলিকে তাদের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে তুলে ধরা। বাংলা সিনেমায় নারী
দৃষ্টিভঙ্গির সূক্ষ্মতা এখনো প্রায় অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে। তাই সমসাময়িক একজন
স্রষ্টা হিসেবে দেবারতির স্বতন্ত্র দৃষ্টিভঙ্গি এই চিরকালীন আখ্যানগুলিকে নতুন ভাবে
বোঝার সুযোগ এনে দেয়।
বাংলা সিনেমায় নারীর গেজ নিয়ে কথা বলার আগে আমি একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করতে চাই, তা হলে আলোচ্য বিষয়ের অনুষঙ্গ বুঝতে সুবিধে হবে। আমার কিছু পুরুষ বন্ধু যারা উত্তমকুমারকে পছন্দ করে না তাদের অপছন্দের এক অদ্ভুত যুক্তি শুনেছিলাম। তারা কিন্তু উত্তমের অভিনয় নিয়ে কিছু বলে না, তাদের আপত্তি ওর কমনীয় স্নিগ্ধ ভাব নিয়ে। উত্তমের ধরণটা নাকি যথেষ্ট পুরুষালি নয়। ঘাড় বেঁকিয়ে কথা বলেন, চোখে কাজল পরেন, নায়িকাদের দিকে সজল সপ্রেম দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকেন যেন ত্রিভঙ্গমুরারি কলির কেষ্ট ঠাকুর - এ কোন যথার্থ পুরুষ মানুষের উদাহরণ হতে পারে না। এর পর ৬০-এর দশকের হিন্দি ছবিতে শাম্মী কাপুর আর ধর্মেন্দ্রর উত্থানের পর নায়কের মারামারি করাটা খুব জরুরি হয়ে পড়ে। ৭০-এর দশক তো অ্যাংরি ইয়ং ম্যানদেরই সময়। কলকাতায় তখন ভারতীয় সিনেমার আসল অ্যাংরি ইয়ং ম্যান মৃণাল সেন, "ইন্টারভিউ" বা "পদাতিক"-এর মতন ছবি বানাচ্ছেন। ও দিকে হিন্দিতে অমিতাভ বচ্চন রেগে গিয়ে যেখানে দাঁড়াচ্ছেন সেখান থেকেই লাইন শুরু হয়ে যাচ্ছে - ফলত বাঙালির কোমল প্রেমিকের প্রতিভূ উত্তমকুমারের আকর্ষণ কমছে। কিন্তু বাংলা সিনেমার ব্যবসায়িক তথ্য বলছে এই সুকোমল সপ্রতিভ নায়কের জনপ্রিয়তা এখনও কমেনি। প্রশ্ন হল কেন? অতীতের বাঙালি জনমানস এ রকম ফেমিনাইজড দুনিয়াই দেখতে চেয়েছিল তার সিনেমায়, সেই জন্যেই কি?

'জতুগৃহ' ছবিতে অরুন্ধতী দেবী এবং উত্তম কুমার
বোধহয় সেই জন্যেই ভারতীয় সিনেমার আদি যুগ অর্থাৎ তিরিশ-চল্লিশের দশক থেকেই বাংলা ছবির ছত্রে ছত্রে এই কমনীয়তা চোখে পড়ে। সেই দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায় - প্রমথেশ বড়ুয়ার আমল থেকেই বাংলা সিনেমা সাদা কালোয় সকল দেশের চাইতে শ্যামল হয়ে ধরা দিয়েছিল। সেই আলোচনায় বিশদে যাবার আগে একবার বুঝে নেওয়া যাক দৃশ্যায়নের মধ্যে দিয়ে মেল গেজ কী ভাবে ফুটে বেরোয়। আর তার সামনে দাঁড়াতে ফিমেল গেজ কী ভাবে নিজেকে প্রস্তুত করতে পারে বা পারে না।
গেজ শব্দটার ঠিক যথাযথ বাংলা প্রতিশব্দ বোধহয় হয় না। Seeing যদি হয় শুধু দেখা, তা হলে Looking হল তাকিয়ে দেখা। আর সেখানে Gaze মানে চেয়ে থাকা - নির্নিমেষ - অপলক… তা হলে তো এই চেয়ে থাকা বড়োই গভীর আর রোমান্টিক বিষয়। এই চেয়ে থাকা নিয়ে কত অপরূপ গান আছে বাংলা ভাষায় - ‘আমি চেয়ে চেয়ে দেখি সারাদিন’ (দেয়া নেয়া)… কিংবা ‘চেয়ে থাকি, চেয়ে থাকি, শ্যাম তোর তরে, তমাল তলায় চেয়ে থাকি…’(হাটে বাজারে)। এ সবের ওপরে স্বয়ং রবি ঠাকুর লিখেছেন, ‘তুমি খুশি থাকো / আমার পানে চেয়ে চেয়ে খুশি থাকো…’। এ সবই তো সেই শরীরী থেকে অশরীরীর দিকে যাত্রা করা গভীর প্রেমের গান। কিন্তু ‘গেজ’ বলতে এত অপাপবিদ্ধ কিছু হলে তো চিন্তা ছিল না। জাঁ পল সার্ত্র বলেছেন, গেজ সততই যার দিকে অপলকে তাকানো হচ্ছে তাকে পণ্যায়িত করে। এবং তার সঙ্গে যার বা যাদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হচ্ছে তারাও সচেতন হয়ে ওঠেন। সার্ত্র একে বলেছেন সেই আগ্রাসী শক্তি যা এ ভাবে নিষ্পলক তাকিয়ে থেকে পরোক্ষে দমন করে চলে। মিশেল ফুকো ‘গেজ’ বিষয়ে বলেছেন, এটি একটি অসম দৃষ্টি নিক্ষেপের ধরণ যা দ্রষ্টা ও দৃশ্যের মধ্যে অসম ক্ষমতার সম্বন্ধ স্থাপন করে।
জাঁ পল সার্ত্র বলেছেন, গেজ সততই যার দিকে অপলকে তাকানো হচ্ছে তাকে পণ্যায়িত করে। এবং তার সঙ্গে যার বা যাদের প্রতি দৃষ্টি নিক্ষেপ করা হচ্ছে তারাও সচেতন হয়ে ওঠেন। সার্ত্র একে বলেছেন সেই আগ্রাসী শক্তি যা এ ভাবে নিষ্পলক তাকিয়ে থেকে পরোক্ষে দমন করে চলে।
তা হলে গেজ বা অপলক চেয়ে থাকা নেহাতই কাব্যিক ও প্রেমময় ঘটনা নয়। ৫০ বছর পেরিয়ে গেছে লরা মালভে মেল গেজ তত্ত্ব সম্বন্ধে আমাদের অবহিত করেছেন, তাঁর ১৯৭৫ এ লেখা ‘ভিস্যুয়াল প্লেজার অ্যান্ড ন্যারেটিভ সিনেমা’ প্রবন্ধে। এখানে লরা মেল গেজ বা পুরুষের (পুরুষতন্ত্রের) লেন্সের তিনটি দিক বা স্তরের কথা বলেছিলেন। একটি হল ক্যামেরা বা যিনি ক্যামেরার পেছনে দাঁড়িয়ে আছেন তাঁর দৃষ্টি (মূলত পুরুষ পরিচালক বা অত্যুর), পরেরটি হল কাহিনির ভেতরে যে পুরুষ চরিত্র বা নায়ক তার নারী চরিত্রের প্রতি তাকানোর ভঙ্গি। আর সব শেষে দর্শকের গেজ অর্থাৎ দর্শক সিনেমাটি দেখে প্রভাবিত হয়ে যে ভাবে নারী চরিত্রের দিকে তাকাচ্ছে। মেল গেজে নির্মিত শিল্পে এই তিনটি স্তরেই নারী কোন না কোন ভাবে ভোগের বস্তু হিসেবেই প্রতিভাত হচ্ছে। এর বিপরীতে ফিমেল গেজকে যদি আমরা খাড়া করতে চাই, তা হলে তা কী রকম হতে পারে? গেজ এর ধারক ও নির্ধারক পুরুষ থেকে নারী হয়ে গেলে কি তাকানোর চরিত্রে পরিবর্তন হতে পারে? বাংলার সবচেয়ে বেশি নন্দিত মহিলা পরিচালক অপর্ণা সেন ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আয়ার’ ছবির প্রিমিয়ারে বলেছিলেন, তাঁর ছবিতে হিংসার দৃশ্যায়নে ফিমেল গেজ স্পষ্ট। যখন হিন্দু দাঙ্গাবাজেরা বৃদ্ধ মুসলিম দম্পতিকে (ভীষ্ম সাহনি আর সুরেখা সিকরি) হত্যা করল, তখন প্রত্যক্ষ ভাবে খুন করা না দেখিয়ে, বৃদ্ধ মানুষটির চশমা পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিল ফ্রেমে। এই ভাবে দেখানো মানে বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাওয়া নয়, বরং যে ভাবে নারীর চোখ অমানবিক হিংসা দেখতে ও দেখাতে অস্বীকার করে তার মূর্তায়ন। কথাটি বলে শ্রীমতী সেন বলেছিলেন গল্পের প্রয়োজনে যদি কোন চরম পুরুষালি দৃশ্যও দেখানো হয়, তাকে মেল গেজ যে ভাবে দেখাবে ও দেখতে চাইবে ফিমেল গেজ সে ভাবে চাইবে না।

'বিদ্যাপতি' ছবিতে কানন দেবী
আবার যদি নারীর বদলে পুরুষের শরীরকে ভোগ্যবস্তুর নিরিখে দৃশ্যায়িত করা হয় তা হলেই কি নারী গেজ সফল হবে? ঠিক যে ভাবে ওরা চেয়ে থেকেছে আমাদের দিকে, এ বার আমাদের সেই অপলক ভোগ-দৃষ্টি ফিরিয়ে দেবার পালা? চেয়ে দেখার ভঙ্গিতে এ রকম প্রতিহিংসা লুকিয়ে থাকলে কিন্তু তা-ও আসলে মেল-গেজই। ফিমেল গেজ যদি মেল গেজের বিরোধী কণ্ঠস্বর হয়ে উঠতে চায়, তবে তার চাহনি সম্পূর্ণ অন্য রকম হতে হবে। আর এ ভাবে শুধু নারী নয় রামধনুর বাকি সকলেই তাকাতে পারে, এমনকি সিস-হেট পুরুষও। আবার উল্টোটাও হতে দেখা গেছে বহু বার। মহিলা পরিচালকের কাজের মধ্যেও মেল গেজের প্রতিফলন দেখা গেছে অনেক ক্ষেত্রেই। ফারহা খান মহিলা পরিচালক হওয়া সত্ত্বেও ‘ওম শান্তি ওমে’ শাহরুখ খানের চেহারাকে যে ভাবে দেখিয়েছেন, বা তাঁর বিভিন্ন ছবিতে নায়িকাদের যে ভাবে দেখানো হয়েছে তা অবশ্যই মেল গেজ। উল্টো দিকে চারুলতা, মহানগরের আরতি বা অরণ্যের দিনরাত্রির জয়া (কাবেরী বসু) - এদের যে ভাবে সত্যজিৎ তুলে ধরেছেন তা মোটেই আগমার্কা মেল গেজ নয়। এগুলির মধ্যে বিরাট দেওয়াল ভাঙার চেষ্টা আছে এবং সেই চেষ্টায় উনি সফলও হয়েছেন।
কিন্তু সত্যজিৎ রায় ভারতীয় সিনেমার মূলধারার বিপরীতে সেই দীর্ঘদেহী বিকল্প যিনি দেওয়াল ভাঙবেন বলেই এসেছিলেন। কিন্তু মূলধারার কিছু পরিচালকের হাতেও অবলীলায় এমন কিছু নারী চরিত্রায়িত হয়েছে যাকে ভারতীয় সিনেমায় ফিমেল গেজ তৈরির ভোরবেলা বললে আমার মতে খুব একটা ভুল হবে না।
গেজ এর ধারক ও নির্ধারক পুরুষ থেকে নারী হয়ে গেলে কি তাকানোর চরিত্রে পরিবর্তন হতে পারে? বাংলার সবচেয়ে বেশি নন্দিত মহিলা পরিচালক অপর্ণা সেন ‘মিস্টার অ্যান্ড মিসেস আয়ার’ ছবির প্রিমিয়ারে বলেছিলেন, তাঁর ছবিতে হিংসার দৃশ্যায়নে ফিমেল গেজ স্পষ্ট
এ রকম কিছু বাংলা ছবিকে ভাল করে খতিয়ে দেখলে হয়তো আমার এই ভাবনার পক্ষে যথেষ্ট যুক্তি আছে কি না, তা বুঝতে সুবিধে হবে। আমি আলোচনায় আনতে চাই তিনটি বাংলা ছবি ও সেগুলির নারী চরিত্রকে - ১৯৩৭ সালের ‘বিদ্যাপতি’, ১৯৫৮ সালে তৈরি ‘ইন্দ্রাণী’ আর ১৯৬৪-তে মুক্তি পাওয়া ‘জতুগৃহ’।
১৯৩৭ সালে দেবকী বসু পরিচালিত ছবি ‘বিদ্যাপতি’। এখানে মহাকবি বিদ্যাপতির (পাহাড়ি সান্যাল) সাধনসঙ্গিনী অনুরাধা (কানন দেবী)। সদা আনন্দময়ী এই নারীকে যখন মিথিলারাজ শিব সিংহ (দুর্গাদাস বন্দ্যোপাধ্যায়) ‘সুন্দরী’সম্বোধনে ডাক দেন, তখন অনুরাধার সপ্রতিভ উত্তর আসে ; রাজার কোন ভুল হয়েছে, আর যাই হোক সুন্দরী সে নয়। আর এই বলার মধ্যে তার কোন ক্ষোভ ধরা পড়ে না। সে পরম আনন্দে, নির্ভয়ে আর পুরুষের দেখার ভঙ্গীর প্রতি এক সহজ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে এই কথাগুলো বলে। প্রায় শতবর্ষের ওপার থেকে এক নারী চরিত্রের মুখে এরকম অনাবিল উচ্চারণ শুনে শিহরণ জাগে বই কি। সেই কবে, ফেমিনিজমের পাঠ বিষয়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত এক তরুণী মেল গেজকে এমন অবলীলায় উড়িয়ে দিচ্ছেন – তা হলে এ এক অন্য ভাবের দুনিয়া। এর পর ছবিটির ক্লাইম্যাক্সে পৌঁছে চমকে উঠেছিলাম। প্রায় নব্বই বছর আগে দেবকী বসু অনুরাধার মধ্যে দিয়ে এক আদর্শ বন্ধুর চরিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। মহারানি লক্ষ্মীদেবী (ছায়া দেবী) যখন বিদ্যাপতির সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে অনুতপ্ত, অনুরাধা তাকে বুঝিয়েছিলেন, যে পাপবোধ থেকে এই অনুতাপ আসছে তা মিথ্যে। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া এক প্রকারের ভয়। আর এই ভয় মনের নয় বরং দেহের। তাই দেহের বাইরে মনের ছুটে আসাকে মানুষ পাপ বলে ধরে নিয়েছে। স্বয়ং মহাকবি বিদ্যাপতিকেও এই নারী বলতে কুণ্ঠা করেনি যে প্রেমের মহাধর্ম মানুষকে বাদ দিয়ে হবে না। রাজা – রানি আর কবির মধ্যে যে ত্রিকোণ প্রেমের গোলকধাঁধা তৈরি হয়েছিল তাকে পরম বন্ধুর মতো অনুরাধা সহজ, স্বাভাবিক ও মানবিক করে তুলেছিল। এই উদার আধুনিকতা আর প্রেমের এহেন বৃহত্তর ধারণাও তো পশ্চিমের থেকে কুড়িয়ে পাওয়া নয়। সহজিয়া – বৈষ্ণবধারায় জারিত বাংলার কৌম-হৃদয়ে এ জিনিস আজন্মলালিত।

'ইন্দ্রাণী' ছবিতে সুচিত্রা সেন
ইন্দ্রাণী ১৯৫৮ সালের ছবি। এক দশক হয়েছে স্বাধীন ভারত রাষ্ট্র জন্ম নিয়েছে। বাঙালির জীবনে গভীরতম জাতীয় বিপর্যয় ঘটে গেছে। প্রায় দেড়-দুই দশক আগে বাঙালির দুই প্রতিনিধি চলে গেছেন। রবীন্দ্রনাথ মারা গেছেন আর সুভাষ ঘরে ফেরেন নাই। এই ভাঙা-গড়ার কালে বাঙালি মধ্যবিত্তের আশা-আকাঙ্ক্ষার মুখ হয়ে উঠে আসেন উত্তম-সুচিত্রা জুটি। ৫৩-৫৪ সাল থেকে উত্তমকুমার হয়ে উঠেছিলেন নতুন দেশ গঠনের কালের গ্রাম থেকে শহরে আসা বিনীত তরুণ যে তার মতো করে নাগরিক বোঝাপড়ায় নামবে। এই তরুণ অপরাজিতর অপু বা নাগরিকের রামু নয় - বরং নিম্নবিত্ত - ভাগ্যান্বেষী বাঙালির আপন ভাগ্য জয় করিবার অধিকার নিয়ে সে এসেছে। এবং এই তরুণের সোজা হয়ে দাঁড়ানো আর ঝকঝকে হাসি দেখে আপামর বাঙালি বুঝেছিল এই তার ভদ্রলোক হয়ে ওঠার স্বপ্ন পূরণ করবে। সেই নায়কের সঙ্গে সঙ্গত দিয়েছিলেন অনেকেই। তবে সবচেয়ে একনিষ্ঠ এবং উত্তমের নায়কত্বের ভারসাম্য বজায় রাখতে যোগ্য সঙ্গিনী হয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। তাঁরা যে কাজগুলি একসঙ্গে করেছিলেন, সেই সব অজয় কর, নীরেন লাহিড়ী, অগ্রদূত বা অগ্রগামী পরিচালিত ছবিগুলি সদ্য স্বাধীন কিন্তু দ্বিখণ্ডিত ভারতীয় বাঙালির সামনে এক নতুন গণতান্ত্রিক মুক্তির আশ্বাস এনেছিল। উত্তম সুচিত্রা পরিবারে তথা সমাজে থেকেও যে মুহূর্তে একে অন্যের প্রেমে পড়ছেন তখনই একান্ত ব্যক্তিগত পরিসর তৈরি করে ফেলছেন, যেখানে বাবা - কাকা - মাসি বা পিসিদের অনুপ্রবেশ ঘটছে না। আর সে রকম কোন বিঘ্ন ঘটলেও তা ওঁরা নিজেদের চেষ্টায় অতিক্রম করে তূরীয় আলিঙ্গনে পৌঁছতে সফল হচ্ছেন। এই যে ব্যক্তি স্বাধীনতার আঙিনা ওঁরা তৈরি করেছিলেন তা বাংলা সিনেমায় গোটা পঞ্চাশ-ষাটের দশকের রোমান্টিসিজমের প্রতিনিধিত্ব করেছে। আর এই রোমান্টিক যুগ ছিল একান্ত ফেমিনাইন। মৈনাক বিশ্বাস তাঁর ২০০০ সালে প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘দ্য কাপল অ্যান্ড দেয়ার স্পেসেস : হারানো সুর অ্যাজ মেলোড্রামা নাও’তে লিখছেন, “আমরা হারানো সুর–এ এমন এক জগত দেখি, যা নারীকেন্দ্রিক এবং ঐতিহাসিক ভাবেও যেন নারীমনস্কতায় রূপান্তরিত। সেখানে নারীভাবের উপস্থিতি স্পষ্ট ভাবে উচ্চারিত। ছবির ভেতরে বহমান আবেগের ভেতরেও আছে এক ধরনের নারীত্বের সুর, এমনকি পুরুষ নায়কও যেন কোমল, সংবেদনশীল—এক ধরনের ‘ফেমিনাইজড’ চরিত্র। আমাদের মনে হয়, এই ছবিটি এমন এক নারীমনস্ক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে, যা কেবল গল্পের নারী চরিত্রের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং তার বাইরে গিয়েও এক স্বতন্ত্র নারীত্বের দৃষ্টিভঙ্গী নির্মাণ করে।”
প্রায় নব্বই বছর আগে দেবকী বসু অনুরাধার মধ্যে দিয়ে এক আদর্শ বন্ধুর চরিত্র নির্মাণ করতে পেরেছিলেন। মহারানি লক্ষ্মীদেবী (ছায়া দেবী) যখন বিদ্যাপতির সঙ্গে পরকীয়া প্রেমে অনুতপ্ত, অনুরাধা তাকে বুঝিয়েছিলেন, যে পাপবোধ থেকে এই অনুতাপ আসছে তা মিথ্যে। সমাজের চাপিয়ে দেওয়া এক প্রকারের ভয়। আর এই ভয় মনের নয় বরং দেহের।
মৈনাক বিশ্বাস দেখিয়েছেন ওই সময়ের নায়ক পেলব, কোমল, ক্ষমাশীল ও কমনীয়। নায়ক তার কামনার নারীর দিকে যখন তাকান, তার মধ্যে এক ধরণের ভীরুতা মিশে থাকে যা নায়িকার চোখে এবং দর্শকের চোখে আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। আমার মনে হয়, এই ব্যাখ্যার মধ্যে আমার পুরুষ বন্ধুদের অপছন্দের বিরুদ্ধেও এক রকমের যুক্তি সাজানো আছে। হয়তো যে উচ্চকিত পুরুষালি ভাবের অনুপস্থিতির জন্য তাদের উত্তমকুমারকে ভাল লাগে না সেটাই মহানায়কের এবং বাঙালিয়ানারও সম্পদ ছিল।
বাংলা সিনেমায় এই ফেমিনাইন দুনিয়া যখন তৈরি হয়ে উঠেছে সেই সময় ‘ইন্দ্রাণী’ ছবিটি পরিচালনা করেন নীরেন লাহিড়ী। এখানে সুদর্শন আর ইন্দ্রাণীর (উত্তম ও সুচিত্রা) আলাপের প্রায় শুরুতেই সুচিত্রা সেন নায়ককে দাবা খেলায় হারিয়ে দিচ্ছেন। গল্প খানিক এগোলে যখন নায়ক-নায়িকার প্রেম বেশ মধ্য গগনে তখন একটি রেস্তোরাঁয় বসে ইন্দ্রানী সুদর্শনকে বিয়ের প্রস্তাব দিচ্ছে। সুদর্শন কিছুটা দ্বিধান্বিত কারণ সে এম এ পাশ করে দু’বছর বসে আছে, চাকরি পায়নি। ইন্দ্রাণী তার দ্বিধা কাটিয়ে বলছে, সে চাকরি করে সংসার চালাবে। এ যে কত বড়ো স্পর্ধার কাজ সে তো আজকের হাইপার ম্যাসক্যুলাইন হিন্দি ছবির দিকে তাকালেই বোঝা যায়।
ইন্দ্রাণী এক শিক্ষিত বেকার তথাপি অব্রাহ্মণ ছেলেকে বিয়ে করতে চায় শুনে যখন তার বাবা তাকে তিরস্কার করে তখন ইন্দ্রাণী জাতিভেদের বিরুদ্ধে কথা বলে। বেকার ছেলে তাকে খাওয়াবে কী, শুনে সে দৃঢ় ভাবে বলে সে পড়াশোনা শিখেছে অন্যের পয়সায় খাবে বলে নয়। এরপর সে যখন স্কুলের চাকরি নিয়ে বেকার স্বামীকে নিয়ে সংসার করতে শুরু করল, তখনই সব সমীকরণ পালটে যেতে থাকল। পুরুষের হতাশা আর হীনমন্যতার প্রতিক্রিয়া দাম্পত্য জীবনে যে প্রকার তিক্ততা তৈরি করতে পারে, তাই হল। এই ছবিটি সত্যজিতের মহানগরের বাণিজ্যিক সংস্করণ বললে খুব একটা অত্যুক্তি হয় না। আর ও রকম ম্যাটিনি আইডল হয়ে ওঠা নায়ক উত্তম কুমার, সুদর্শনের মতো ব্যর্থ, দ্বিধাগ্রস্ত, আপাত কাপুরুষ চরিত্রে অভিনয় করতে রাজি হবার ঘটনাও একটা দিক নির্দেশ করে। সেই সময়ের বাংলার পপুলার কালচারের (জনপ্রিয় সংস্কৃতি) মধ্যে অন্তর্নিহিত কাউন্টার কালচারের ঝোঁক (বিরোধী সংস্কৃতি) ছিল বলেই উত্তম বাণিজ্যিক ছবিতে এ রকম চরিত্র করেছিলেন বলেই মনে হয়।

'ইজাজত' ছবিতে রেখা
এর পর ১৯৬৪ সালের তপন সিংহ পরিচালিত ছবি 'জতুগৃহ'। সুবোধ ঘোষের কাহিনি অবলম্বনে ষাটের দশকের এই ছবিটি আজ বাষট্টি বছর পরেও কী ভীষণ আধুনিক এবং উদার। এই ছবিতে ভাবে-ভঙ্গীতে, আকারে-ইঙ্গিতে, কথায় বা চলনে আলাদা করে নারী-পুরুষের সমানতার উল্লেখ করতে হয় নি। কারণ ছবিটির আবহে শুরু থেকেই দেখানো হচ্ছে স্বামী-স্ত্রী দাঁড়িপাল্লায় সমান। তারা সমান ভাবে সুখী আবার সমান ভাবেই অসুখীও। কারণ তাদের বিবাহিত জীবনের অসুখের জন্যে দুজনে সমান ভাবে দায়ী। কারো দায় বেশি বা কম নয়। শতদল আর মাধুরীর (উত্তম কুমার ও অরূন্ধতী দেবী) সুসজ্জিত বিবাহিত জীবনে ভালো থাকার রসদের কোন অভাব নেই। শুধু একটিই অভাব - এখনো সন্তান আসে নি। যখন জানা গেল মাধুরীর শারীরিক অবস্থার জন্য সন্তান জন্ম দেওয়া কঠিন তখন শতদল ডাক্তারের কাছে গিয়ে নিজেকেও পরীক্ষা করে আসে। হয়তো তার মধ্যেই কোন খুঁত আছে। কিন্তু ডাক্তার জানায় শতদলের জন্য নয়, মাধুরীর শরীরই সন্তান ধারণে প্রস্তুত নয়। এর পর থেকে মাধুরীর হীনমন্যতা বাড়তে থাকে যা আপাত শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে দুরূহ করে তোলে। অথচ শতদল এক বারের জন্যেও মাধুরীর দিকে আঙুল তোলেনি। এই যে কারো কোন দোষ নেই অথচ সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া, এই ঘটনা এক উদার মুক্ত ও গণতান্ত্রিক পরিবেশেই ঘটা সম্ভব। বলা বাহুল্য জতুগৃহে উত্তম কুমার ও অরূন্ধতী দেবীর সহজ অভিনয় ছবিটিকে আরো বেশী বাস্তব, চরিত্র দুটিকে যথার্থরূপে অসহায় আর এই সব মিলিয়ে দর্শকের অনুভূতিকে ব্যক্তিগত করে তুলতে পেরেছিল। এই প্রসঙ্গে 'জতুগৃহ' অবলম্বনে একটি জনপ্রিয় হিন্দি ছবির উল্লেখা করতে চাইব। গুলজার পরিচালিত ‘ইজাজত’ ১৯৮৭ সালে মুক্তি পায়। এই গল্পে স্বামী মহেন্দ্র ও স্ত্রী সুধার মধ্যে (নাসিরুদ্দিন শাহ ও রেখা অভিনীত) মন কষাকষি শুরু হয় মহেন্দ্রর জীবনে দ্বিতীয় নারী মায়ার (অনুরাধা পাটেল) উপস্থিতির জন্যে। এর পর দুজনের বিচ্ছেদের বেশ কিছু বছর পর যখন 'জতুগৃহে'র মতোই দুজনের আবার রেলের ওয়েটিং রুমে দেখা হয় তখন জানা যায় সুধা এখন বিবাহিত। এবার শেষ বারের মতো বিদায় নেবার কালে সুধা মহেন্দ্রর পায় হাত দিয়ে প্রণাম করে যাবার অনুমতি নিয়ে যায়। এ দিকে বাংলা ছবিটিতে শেষে শতদল মাধুরীকে জিজ্ঞেস করে তারা দুজনেই যখন একা তা হলে আবার দুজনের একসঙ্গে হতে বাধা কোথায়? তখন মাধুরীই স্নেহের সঙ্গে এই প্রস্তাব নাকচ করে দেয়। একবার দাঁড়ি টানার পর তাকে মান্য করাই শ্রেয় বলে মনে হয় তার। আমার ব্যক্তিগত ভাবে 'জতুগৃহ'কে ইজাজতের থেকে বেশি গভীর মনে হয়েছে। তার সঙ্গে জতুগৃহ নিশ্চিত ভাবে আমাদের আলোচিত সেই ফেমিনাইজড জগতের আশ্বাস দেয়।
ইন্দ্রাণী এক শিক্ষিত বেকার তথাপি অব্রাহ্মণ ছেলেকে বিয়ে করতে চায় শুনে যখন তার বাবা তাকে তিরস্কার করে তখন ইন্দ্রাণী জাতিভেদের বিরুদ্ধে কথা বলে। বেকার ছেলে তাকে খাওয়াবে কী, শুনে সে দৃঢ় ভাবে বলে সে পড়াশোনা শিখেছে অন্যের পয়সায় খাবে বলে নয়।
পুরনো সম্পর্ককে স্মৃতি করে রেখে দেবার ইচ্ছের মধ্যেও এক রকমের চেয়ে দেখা আছে। এই চেয়ে দেখাকে পরিচালক সিলিন সিয়ামা বলেছেন ‘গেজ কখনও কখনও স্মৃতির দিকে ফিরে তাকাবার ধরণও’। সিয়ামা পরিচালিত ‘পোর্ট্রেট অফ আ লেডি অন ফায়ার’ সিনেমাটিকে ফিমেল গেজের একটি যথাযথ রাজনৈতিক উদযাপন বলে ধরে নিয়েছেন বহু জেন্ডার স্টাডিসের গবেষক। সিয়ামা বলেছিলেন উনি যে প্রেমের গল্প বলতে চেয়েছিলেন তা আসলে একটি অপূর্ণ প্রেমের স্মৃতি। আর যে কোন স্মৃতিচারণই এক ধরণের চেয়ে দেখা। ‘তোমার আঙিনাতে বেড়াই যখন’ আবার যখন বেড়াই না তখনও তুমি আমার পানে চেয়ে চেয়ে খুশি থাকো। রবি ঠাকুরের দেখানো পথে যদি তার পানে চেয়ে আমায় খুশি থাকতে হয়, তা হলে আমার গেজ লিঙ্গভিত্তিক ক্ষমতা কাঠামোর বাইরে থাকতে বাধ্য। জতুগৃহের শেষে মাধুরী হয়তো শতদলের স্মৃতির দিকে সে ভাবেই চেয়ে থাকতে চায়।
এই তিনটি ছবি ছাড়াও আরো অনেক ছবির নাম পুরনো বাংলা ছবির ভান্ডার থেকে বের করে আনা যায়। হারানো সুর, সাত পাকে বাঁধা থেকে শুরু করে সপ্তপদী, পুষ্পধনু, আমি সে ও সখা ইত্যাদি অনেক নাম উঠে আসবে। আর এগুলো সবই পুরুষ পরিচালকের বানানো।
এখানে একটা কথা পরিষ্কার হওয়া দরকার যে ফেমিনাইন বা ফেমিনিস্ট গেজ বলতে আমরা নারীর লেন্সকেই বুঝি। এই ভাবনায় কোন দ্বিমত নেই। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে ভার্জিনিয়া উলফের ‘আ রুম অফ ওয়ানস ওন’ আমাদের সচেতন ভাবে পড়তে শিখিয়েছিল নারীর বয়ানে নারীর গল্প কী রকম আলাদা হতে পারে। তাই অরূন্ধতী দেবী পরিচালিত ‘ছুটি’ বা অপর্ণা সেনের ‘পরমা’ একেবারে অন্য জানলার হদিস দেয়। যে জানলা আগে কোন দিনও খোলা হয় নি। তবে আগে উল্লিখিত হারানো সুর বা ইন্দ্রাণী ছবিগুলি হয়তো এমন পরিবেশ তৈরি করতে পেরেছিল যাতে এই নতুন খিড়কিগুলোর আগল শিথিল হতে শুরু করেছিল। আরেকটা মজার কথা হল, পুরুষতন্ত্রে সুবিধেজনক উচ্চতায় বসে থাকা সিস-হেট পুরুষের লেন্স বদলে ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গী থেকে গল্প বলতে চাওয়া একটা চিনের পাঁচিল ভেঙে ফেলার মতোই কঠিন। বাংলার সমাজ জীবনে সেই উনবিংশ শতক থেকেই এই প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল বলেই হয়তো সিনেমাতেও এই উদারতা দেখানো সম্ভব হয়েছে।

'জতুগৃহ' ছবিতে অরুন্ধতী দেবী
ফিমেল গেজের যে আলোচনা দিয়ে লেখা শুরু করেছিলাম, একবার তাকে ঝালিয়ে নিয়ে দেখা যাক যে ছবিগুলির উল্লেখ করেছি সেগুলি এই নিরিখে কতটা উত্তীর্ণ। বছর দশেক আগে মার্কিনি টি ভি পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার জোয়ে সোলোওয়ে (ট্রান্সপেরেন্ট, আই লাভ ডিক) তাঁর ‘ফিমেল গেজ’ নিয়ে একটি লেখায় তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণার কথা বলেন— ফিলিং সিইং, দ্য গেইজড গেজ, এবং রিটার্নিং দ্য গেজ।
‘ফিলিং সিইং’তখন ঘটে, যখন ক্যামেরা হয়ে ওঠে সম্পূর্ণ ব্যক্তিনিষ্ঠ। নির্মাতা এমন এক ভাষা তৈরি করেন, যেখানে দর্শক চরিত্রটিকে বাইরে থেকে কেবল দেখে না, বরং তার ভেতরের অনুভূতি ও চিন্তার স্রোতের মধ্যে অনায়াসে নিমজ্জিত হতে পারে।
‘দ্য গেইজড গেজ’ দর্শকের সঙ্গে এক অন্তরঙ্গ সংযোগ তৈরি করে— যেন দর্শক শুধু চরিত্রগুলিকে দেখছে না, বরং নিজেই দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠার এক অভিজ্ঞতা অনুভব করছে।
আর ‘রিটার্নিং দ্য গেজ’ হল দৃশ্য আর দ্রষ্টার ভূমিকার এক সচেতন স্থান বদল। পর্দায় নারীকে নিছক বস্তু হিসেবে দেখার ধারণাকে অস্বীকার করে এটি। এখানে আকাঙ্ক্ষার দৃষ্টি একমুখী নয়; দর্শক ও চরিত্রের মধ্যে তা সমান ভাবে ভাগ হয়ে যায়।
এই তিনটি ধারণা মিলিয়ে সোলোওয়ে ‘ফিমেল গেজ’- কে দেখেন স্বভাবতই ভঙ্গুর, ব্যক্তিগত এবং প্রতিস্পর্ধী এক দৃষ্টি হিসেবে— যা একই সঙ্গে দেখার ও দ্রষ্টব্য হয়ে ওঠার অভিজ্ঞতাকে বদলে দেয়। কিংস কলেজ লন্ডনের চলচ্চিত্র বিভাগের অধ্যাপিকা, জিনেট ভাঁসাঁদোর তত্ত্ব অনুযায়ী একে হয়তো ‘ফিমেল গেজের পারস্পরিকতা’ বলা যেতে পারে — যেখানে উপস্থাপিত ব্যক্তি ও উপস্থাপনকারী ব্যক্তির মধ্যে ক্ষমতার সম্পর্কটি তুলনামূলক ভাবে সমান। অধ্যাপক ভাঁসাদোর এর মতে, এ এক স্পষ্ট নারীবাদী ভঙ্গি।
তা হলে মহামান্য সার্ত্র ‘গেজ’ শব্দটির ক্ষমতা-রাজনীতি বিষয় যা বলেছিলেন, বোঝা যায় তা সম্পূর্ণ রূপে মেল গেজ বিষয়েই বলা। সিনেমার ক্ষেত্রে এই গেজ কী ভাবে কাজ করে তা প্রাঞ্জল করে লরা মালভে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু এর পাল্টা ফিমেল গেজ যে রাজনৈতিক অবস্থান নেবার স্পর্ধা ও আকাঙ্ক্ষা রাখতে চায়, দেখা যাচ্ছে তা বাংলা সিনেমার সাদা কালো জমানায় অনায়াসে উদযাপিত হয়েছে। উত্তর ঔপনিবেশিক যুগে উত্তর রেনেসাঁসের যে বাঙালিয়ানা টিঁকেছিল, সেই অভ্যাসের মধ্যেই সহজে ফিমেল গেজের আবহ রচিত হয়েছিল বাংলা সিনেমার স্বর্ণযুগে।
পুরনো সম্পর্ককে স্মৃতি করে রেখে দেবার ইচ্ছের মধ্যেও এক রকমের চেয়ে দেখা আছে। এই চেয়ে দেখাকে পরিচালক সিলিন সিয়ামা বলেছেন ‘গেজ কখনও কখনও স্মৃতির দিকে ফিরে তাকাবার ধরণও’
লেখক পরিচয়:
দেবারতি গুপ্ত কলকাতার একজন স্বাধীন চলচ্চিত্র পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার। গত বারো বছরে তিনি ছয়টি পূর্ণদৈর্ঘ্য কাহিনিচিত্র এবং দুটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র পরিচালনা করেছেন। যেগুলির বেশ কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে ও ওটিটি প্ল্যাটফর্মে মুক্তি পেয়েছে। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে 'হইচই', 'কল্কিযুগ' এবং 'অনেক দিনের পরে'। তাঁর পরের ছবি 'হাসনুহানা'র কাজ চলছে।
মিডিয়া স্টাডিজে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দেবারতি তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন পরিচালক বিমুক্তি জয়সুন্দর এবং বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের সহকারী পরিচালক হিসেবে। বর্তমানে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিথি অধ্যাপক হিসাবে ফিল্ম স্টাডিজ পড়ান এবং পত্রপত্রিকায় চলচ্চিত্র ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।